ঢাকা ০৩:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ মে ২০২৪, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

হারিয়ে যাচ্ছে শস্যভান্ডার খ্যাত সিংগাইরের কৃষি জমি

সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কড়া নির্দেশ “কৃষি জমি ধবংস করে কোনো উন্নয়ন নয়’’। এ নির্দেশকে থেরাই কেয়ার করে রাজধানী ঢাকার উপকন্ঠ মানিকগঞ্জের সিংগাইরে ব্যাপকভাবে চলছে কৃষি জমি ধ্বংস । উপজেলা জুড়ে কৃষিজমির বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে উঠছে নতুন নতুন বসতি, কারখানা, ইটভাটা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। আবাসন ও বাণিজ্যিক কাজে ফসলি জমির ব্যবহার চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। অপরিকল্পিত ভরাটের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে খাল-বিল, নদী-নালা, জলাধারাসহ ছোট বড় অসংখ্য পুকুর-ডোবা। ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ দূষণ।
এদিকে, কৃষি জমি সবচেয়ে বেশি ধ্বংস করছে বৈধ-অবৈধ প্রায় ৬০টি ইটভাটা। ব্যাপকহারে ইটভাটা গড়ে উঠার বিরূপ প্রভাব পড়েছে পরিবেশের ওপর। এ ছাড়া ভাটায় ইট তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে তিন ফসলি জমির মাটি। ভাটার পার্শ্ববর্তী জমিগুলোরও উর্বরতা শক্তি বিনষ্ট হচ্ছে মারাত্মকভাবে। অনেক জায়গায় কল-কারখানা-আবাসিক প্রকল্পের নামে বালু দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে বিশাল এলাকা জুড়ে কৃষি জমি। ব্যাঙের ছাতার মত পাড়া-মহল্লায় বসতবাড়ি ঘেঁষে গড়ে ওঠছে শব্দ ও পরিবেশ দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান। এতে অনেকেরই পৈত্রিক বাড়ি ঘর ছেড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। চোখের সামনে কৃষিজমি এমনভাবে ধ্বংস হলেও দেখার যেন কেউ নেই ।


উপজেলা কৃষি অফিসের দেয়া তথ্যানুযায়ী, সিংগাইরে নীট কৃষি জমির পরিমাণ রয়েছে- ১৬২৪৫ হেক্টর। এরমধ্যে উঁচু ৫৫১৮ হেক্টর, মাঝারী উঁচু ৮১৫৮ হেক্টর , মাঝারী নিচু ২২৬৬ হেক্টর এবং নিচু জমির পরিমাণ ৩০৩ হেক্টর। এছাড়া এক ফসলি জমি রয়েছে ৭১০ হেক্টর, দুই ফসলি ৬৩০৬ হেক্টর , তিন ফসলি ৯০১৪ হেক্টর এবং চার ফসলি জমি রয়েছে ২১৫ হেক্টর। এদিকে ভুমিহীন কৃষক রয়েছে ৭২৭৪ জন, প্রান্তিক ৩১৫১১ জন, ক্ষুদ্র ৬৮৭১ জন, মাঝারী ৪১৭১ জন এবং বড় কৃষক রয়েছে ৪৮১ জন।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে , বিভিন্ন স্থানে বেপরোয়াভাবে চলছে কৃষি জমি ধবংস করার ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। ধল্লা ইউনিয়নের ধলেশ^রী নদীর পাড়ে ৫৪ একর কৃষি জমিতে বালু ভরাট করে গভর্নমেন্ট অফিসার্স কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি নির্মাণের নামে কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। তার অদূরে আরসিএল নামের প্রতিষ্ঠানটি ৪০ একর জমি ক্রয় করে বাউন্ডারি দেয়াল দিয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানও নির্মাণ করেছেন। ফোর্ডনগর এলাকায় আকতার ফার্নিচার প্রায় ৩০ একর জমি নিয়ে কারখানা তৈরি করেছেন। এ ছাড়া জার্মিত্তা ইউনিয়নের বিন্নাডাঙ্গী এলাকায় ৩৩ একর কৃষি জমি ধবংস করে ওয়েষ্ট প্রকল্পের নির্মাণ কাজ চলছে। ডিসি ভিটা নামে ৭ একর, আরসিএল কোম্পানির ৫ একর ও শাহ-মেরিনের ৩ একর জমি চলে গেছে ফসল উৎপাদনের বাইরে। ওই এলাকাতে নদীর তীরে দুইটি নর্দান পাওয়ার প্ল্যান্ট নামের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে ওঠায় ব্যাপকভাবে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। নির্গত কালো ধোঁয়ায় চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কৃষি জমি রক্ষায় এসব বন্ধ না হলে ভবিষতে ফসল উৎপাদনের জমি পাওয়া যাবে না। চাপরাইল গ্রামের বাসিন্দা ও ইটভাটা স্থাপন প্রতিরোধ কমিটির সাংগঠনিক সম্পাক আবু সায়েম বলেন, ফসলি জমি রক্ষায় মাটি কাটা বন্ধে মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিলেও তা বন্ধ করা হয়নি। উল্টো প্রতিবাদকারীরা হয়েছে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন- জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিতভাবে আবাসন, শিল্প-কারখানা, রাস্তাঘাট, পুকুর খনন ও ইটভাটাসহ নানা কারণে প্রতি বছরই কমছে আবাদি জমির পরিমাণ। যেভাবে সিংগাইরে কৃষিজমি অকৃষিতে চলে যাচ্ছে, তাতে আগামী ১০ বছরের মধ্যে বিলুপ্ত হতে পারে কৃষি জমি। তারা কৃষি জমি রক্ষায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ দাবীও করেন।
এ প্রসঙ্গে, সিংগাইর উপজেলা কৃষি অফিসার আবুল বাশার বলেন, কৃষি জমি ধবংস শুধু সিংগাইরে নয়, সারা দেশে এমন চিত্র। সচেতনার পাশাপাশি কঠোর আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে এটা বন্ধ সম্ভব।
সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী অফিসার দিপন দেবনাথ বলেন, কৃষি জমি রক্ষায় বিভিন্ন ফোরামে আলোচনার মাধ্যমে কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসকের চিঠির প্রেক্ষিতে কৃষি জমিতে স্থাপনা নির্মাণে আগের মতো অনুমোদন দেয়া হচ্ছে না। কেউ কৃষি জমি ধ্বংস করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া বলেও তিনি জানান।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

Dainik Renaissance

আমাদের ওয়েসাইটে আপনাকে স্বাগতম। আপনাদের আশে পাশের সকল সংবাদ দিয়ে আমাদের সহযোগীতা করুন
আপডেট সময় ০৫:১০:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৩
১৮৩ বার পড়া হয়েছে

হারিয়ে যাচ্ছে শস্যভান্ডার খ্যাত সিংগাইরের কৃষি জমি

আপডেট সময় ০৫:১০:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৩

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কড়া নির্দেশ “কৃষি জমি ধবংস করে কোনো উন্নয়ন নয়’’। এ নির্দেশকে থেরাই কেয়ার করে রাজধানী ঢাকার উপকন্ঠ মানিকগঞ্জের সিংগাইরে ব্যাপকভাবে চলছে কৃষি জমি ধ্বংস । উপজেলা জুড়ে কৃষিজমির বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে উঠছে নতুন নতুন বসতি, কারখানা, ইটভাটা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। আবাসন ও বাণিজ্যিক কাজে ফসলি জমির ব্যবহার চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। অপরিকল্পিত ভরাটের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে খাল-বিল, নদী-নালা, জলাধারাসহ ছোট বড় অসংখ্য পুকুর-ডোবা। ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ দূষণ।
এদিকে, কৃষি জমি সবচেয়ে বেশি ধ্বংস করছে বৈধ-অবৈধ প্রায় ৬০টি ইটভাটা। ব্যাপকহারে ইটভাটা গড়ে উঠার বিরূপ প্রভাব পড়েছে পরিবেশের ওপর। এ ছাড়া ভাটায় ইট তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে তিন ফসলি জমির মাটি। ভাটার পার্শ্ববর্তী জমিগুলোরও উর্বরতা শক্তি বিনষ্ট হচ্ছে মারাত্মকভাবে। অনেক জায়গায় কল-কারখানা-আবাসিক প্রকল্পের নামে বালু দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে বিশাল এলাকা জুড়ে কৃষি জমি। ব্যাঙের ছাতার মত পাড়া-মহল্লায় বসতবাড়ি ঘেঁষে গড়ে ওঠছে শব্দ ও পরিবেশ দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান। এতে অনেকেরই পৈত্রিক বাড়ি ঘর ছেড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। চোখের সামনে কৃষিজমি এমনভাবে ধ্বংস হলেও দেখার যেন কেউ নেই ।


উপজেলা কৃষি অফিসের দেয়া তথ্যানুযায়ী, সিংগাইরে নীট কৃষি জমির পরিমাণ রয়েছে- ১৬২৪৫ হেক্টর। এরমধ্যে উঁচু ৫৫১৮ হেক্টর, মাঝারী উঁচু ৮১৫৮ হেক্টর , মাঝারী নিচু ২২৬৬ হেক্টর এবং নিচু জমির পরিমাণ ৩০৩ হেক্টর। এছাড়া এক ফসলি জমি রয়েছে ৭১০ হেক্টর, দুই ফসলি ৬৩০৬ হেক্টর , তিন ফসলি ৯০১৪ হেক্টর এবং চার ফসলি জমি রয়েছে ২১৫ হেক্টর। এদিকে ভুমিহীন কৃষক রয়েছে ৭২৭৪ জন, প্রান্তিক ৩১৫১১ জন, ক্ষুদ্র ৬৮৭১ জন, মাঝারী ৪১৭১ জন এবং বড় কৃষক রয়েছে ৪৮১ জন।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে , বিভিন্ন স্থানে বেপরোয়াভাবে চলছে কৃষি জমি ধবংস করার ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। ধল্লা ইউনিয়নের ধলেশ^রী নদীর পাড়ে ৫৪ একর কৃষি জমিতে বালু ভরাট করে গভর্নমেন্ট অফিসার্স কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি নির্মাণের নামে কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। তার অদূরে আরসিএল নামের প্রতিষ্ঠানটি ৪০ একর জমি ক্রয় করে বাউন্ডারি দেয়াল দিয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানও নির্মাণ করেছেন। ফোর্ডনগর এলাকায় আকতার ফার্নিচার প্রায় ৩০ একর জমি নিয়ে কারখানা তৈরি করেছেন। এ ছাড়া জার্মিত্তা ইউনিয়নের বিন্নাডাঙ্গী এলাকায় ৩৩ একর কৃষি জমি ধবংস করে ওয়েষ্ট প্রকল্পের নির্মাণ কাজ চলছে। ডিসি ভিটা নামে ৭ একর, আরসিএল কোম্পানির ৫ একর ও শাহ-মেরিনের ৩ একর জমি চলে গেছে ফসল উৎপাদনের বাইরে। ওই এলাকাতে নদীর তীরে দুইটি নর্দান পাওয়ার প্ল্যান্ট নামের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে ওঠায় ব্যাপকভাবে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। নির্গত কালো ধোঁয়ায় চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কৃষি জমি রক্ষায় এসব বন্ধ না হলে ভবিষতে ফসল উৎপাদনের জমি পাওয়া যাবে না। চাপরাইল গ্রামের বাসিন্দা ও ইটভাটা স্থাপন প্রতিরোধ কমিটির সাংগঠনিক সম্পাক আবু সায়েম বলেন, ফসলি জমি রক্ষায় মাটি কাটা বন্ধে মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিলেও তা বন্ধ করা হয়নি। উল্টো প্রতিবাদকারীরা হয়েছে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন- জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিতভাবে আবাসন, শিল্প-কারখানা, রাস্তাঘাট, পুকুর খনন ও ইটভাটাসহ নানা কারণে প্রতি বছরই কমছে আবাদি জমির পরিমাণ। যেভাবে সিংগাইরে কৃষিজমি অকৃষিতে চলে যাচ্ছে, তাতে আগামী ১০ বছরের মধ্যে বিলুপ্ত হতে পারে কৃষি জমি। তারা কৃষি জমি রক্ষায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ দাবীও করেন।
এ প্রসঙ্গে, সিংগাইর উপজেলা কৃষি অফিসার আবুল বাশার বলেন, কৃষি জমি ধবংস শুধু সিংগাইরে নয়, সারা দেশে এমন চিত্র। সচেতনার পাশাপাশি কঠোর আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে এটা বন্ধ সম্ভব।
সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী অফিসার দিপন দেবনাথ বলেন, কৃষি জমি রক্ষায় বিভিন্ন ফোরামে আলোচনার মাধ্যমে কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসকের চিঠির প্রেক্ষিতে কৃষি জমিতে স্থাপনা নির্মাণে আগের মতো অনুমোদন দেয়া হচ্ছে না। কেউ কৃষি জমি ধ্বংস করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া বলেও তিনি জানান।