ঢাকা ০২:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ মে ২০২৪, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

পারিবারিক সম্পত্তিতে মুসলিম নারীর অধিকার

মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনির

নারীও মানুষ। পারিবারিক ও সামাজিক ভাবে তাদেরও রয়েছে জন্মগত অধিকার। এই সত্যটি সুপ্রতিষ্ঠিত করতেই চলছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম। এ আধুনিক যুগেও বৈশ্বিকভাবে উচ্চারিত হতে শুনি, চাই নারীর অধিকার। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার সমাজ ব্যবস্থায় নারীর অগ্রযাত্রা, দায়িত্বশীলতা এবং সাফল্যের বয়ান গাঁথা তৈরি হলেও নারীর প্রতি সহিংসতা, নিষ্ঠুর আচরণ, তাদেরকে অর্ধ নাগরিক করে রাখার অপচেষ্টা সবসময় বিদ্যমান ছিল। আধুনিক সমাজ ব্যবস্থাতেও নানা ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছে নারীরা। এর মধ্যে পরিবারের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা অন্যতম। অনেক নারীরা তাদের অধিকার সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৬, ২৭, ২৮, ২৯ অনুচ্ছেদগুলোতে নারী-পুরুষের সমঅধিকার ঘোষণা করা হয়েছে। তবে, ব্যক্তিজীবনে অধিকার, সুযোগ, দায়িত্ব পালনে ধর্মীয় আইনের উপর নির্ভর করা হয়। যেমন- বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, সন্তানের উত্তরাধিকার, পুত্র-কন্যার সম্পত্তিতে অধিকার, নারী-পুরুষের সম্পদ সম্পত্তিতে অধিকারসমূহ। মুসলিম আইনে বাবার সম্পত্তিতে একজন ছেলে সন্তান যে ভাগ পায়, কন্যা সন্তান তার অর্ধেক পাবে। বাবা ছাড়াও অন্য সম্পর্ক থেকেও নারীরা সম্পত্তির ভাগ পেয়ে থাকে। যেমন, মা-বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় তাদের সন্তান যদি মারা যায়, তাহলে মৃত সন্তানের সম্পত্তির ভাগ তার মা-বাবা পাবেন। মৃত ব্যক্তির সন্তানসন্ততি থাকলে মা মোট সম্পত্তির ১/৬ অংশ পাবেন। যদি মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান না থাকে এবং দুই বা ততোধিক ভাইবোন থাকে, তাহলেও ১/৬ অংশ মা পাবেন। তবে মৃত ব্যক্তির সন্তানাদি না থাকলে এবং একজনের বেশি ভাই বা বোন না থাকলে মা ১/৩ অংশ পাবেন। আবার মৃত ব্যক্তির বাবা থাকলে এবং তার স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকলে স্বামী বা স্ত্রীর অংশ দেয়ার পর বাকি সম্পত্তির ১/৩ অংশ মা পাবেন। একজন নারী স্ত্রী হিসেবে মৃত স্বামীর সম্পত্তি ২ ভাবে পাবে। (১) যদি মৃত ব্যক্তির এবং তার স্ত্রীর সন্তান বা পুত্রের সন্তান থাকে তবে স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির ১/৮ ভাগ পাবেন। (২) যদি মৃত ব্যক্তি এবং তার স্ত্রীর সংসারে কোন সন্তান না থাকে তাহলে স্ত্রী মোট সম্পত্তির ১/৪ ভাগ পাবেন।
বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় বিধান থাকা সত্বেও পৈতৃক সম্পত্তিতে মুসলিম নারীর অধিকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনর্জিত থেকে যায়। এর মূল অন্তরায় সামাজিক সচেতনতার অভাব, অরাজক পরিবেশ ও নারীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ। আইন অনুযায়ী বাবা, স্বামী ও স্বজনের সম্পত্তিতে নারীর অধিকারের পরিমাণ যাই হোক না কেন, মূল প্রশ্ন হচ্ছে- এই অধিকারটুকু নারীরা অর্জন ও ভোগদখলের সুবিধা পাচ্ছেন কিনা? যদি কেউ পেয়ে থাকেন তা অবশ্যই মোটের তুলনায় খুবই নগণ্য।
আমাদের সমাজে এমন কিছু ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে যে, বাপের সম্পত্তির অংশ মেয়েরা নিয়ে নিলে স্বামীর সংসারে অনটন নেমে আসে এবং ভাই-বোনদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে, ছেলেমেয়েরা মামার বাড়িতে যাবার বা আপ্যায়ন পাবার যোগ্যতা হারায়। এটি মেয়েদের স্থায়ীভাবে ঠকানোর চতুরতা ছাড়া আর কিছুই নয়। ভাইয়েরা বোনদের অংশ ভোগদখল করলে যদি অভিশপ্ত না হয়, সম্পর্কের অবনতি না হয়, আপ্যায়নে ঘাটতি না হয়, সেক্ষেত্রে বোনদের অপরাধ কোথায়? বোনের প্রাপ্য সম্পত্তি ভাই, ফুপুর সম্পত্তি ভাইপো জোর করে ভোগদখল করবে তাতে অপরাধ হবে না অথচ পিতামাতার সম্পত্তির বৈধ অংশ কন্যা ভোগদখল করলেই অভিশপ্ত হবে, এটি নিছক ভ্রান্ত ধারণা ও অপপ্রচার ছাড়া অন্য কিছু নয়। ইসলাম ধর্মে ও আমাদের রাষ্ট্রীয় আইনে অন্যের সম্পত্তি ভোগদখল করার কোনও বৈধতা নেই। বরং কাউকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা অপরাধ। অবাক বিষয়, আমাদের সমাজে এমন অনেক বাবা আছেন, যারা কিনা ধর্মীয় সকল নিয়ম-কানুন মেনে চলেন কিন্তু নিজের মেয়ে সন্তানদের বঞ্চিত করে তার সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কূটকৌশলে ছেলের দখলে দিয়ে মরে যায়।ভাইয়ের জন্য নির্দ্বিধায় প্রাণও দিতে পারে সেই ভাই-ই বোনের প্রাপ্যাংশ না দেয়া বা কম দেয়ার জন্যে আঁটে নানান কূটকৌশল। কেউ কেউ আবার বছরে দু-একটা দাওয়াত ও কাপড়চোপড় দিয়েই সারতে চায় বোনের প্রাপ্য সম্পত্তি না দেয়ার দায়। কোনও অসতর্ক, অসুস্থতা বা বিপদের সময় বাবা, মা, ফুপু বা বোনের স্বাক্ষর বা টিপসই নিয়ে তাদেরেকে অধিকার বঞ্চিত করে বা করার চেষ্টা করে, এমন সংখ্যাও কম নয়।


মেয়েরা কখনও কখনও সম্পত্তির অধিকার চাইতে গেলে বলা হয়, তোমাকে লালন-পালন করানো হয়েছে, লেখাপড়া করানো হয়েছে, বিয়ে দেয়া হয়েছে, আবার সম্পত্তি দেবো কেন! অথচ মেয়ের চেয়ে ভালোভাবে লালন-পালন, অধিক লেখাপড়া করিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করানো, অধিক ব্যয়ে বিয়েশাদি করানো ছেলের ভোগদখলেই থাকছে সব সম্পত্তি!
আমাদের সমাজে অনেক মুসলিম নারী স্বামীর সম্পত্তিতে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বা ভোগ-দখলের জন্য যতটুকু সংগ্রাম করে, পৈতৃক সম্পত্তিতে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বা ভোগ-দখলের জন্য ততটুকু সংগ্রাম করতে দেখা যায় না। যৌক্তিক, অযৌক্তিক ও ভ্রান্ত ধারণার কারণেই হোক, পৈতৃক সম্পত্তি গ্রহণ ও ভোগদখল না করে উদারতা দেখালেও, নিঃশর্তে দলিল করে ভাইকে দিয়ে দেয় এমন নজির খুবই কম। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা তার রক্তের অধিকার পৈতৃক সম্পত্তির দাবি সত্যিকার অর্থে মন থেকে ত্যাগ করতে পারে না। এ দাবি অব্যাহত রেখেই মৃত্যুবরণ করে। নারীর মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীরা দাবি আদায় করতে গেলেই শুরু হয় বিবাদ, পারিবারিক অসামাজিক অশান্তি, হামলা-মামলার মতো অনেক ন্যক্কারজনক ঘটনা।
কোনও নারী যদি মনে করে তার পিতামাতার নিকট থেকে প্রাপ্ত অংশ ভাইকে বা ভাইয়ের সন্তানদের দিয়ে দেবেন, দিতেই পারেন তবে এটি মনে রাখা উচিত- প্রাপ্য সম্পত্তির ওপর নিজের সন্তানের অধিকার ও দাবি সবার আগে। নিজের সন্তানকে বঞ্চিত করে ভাই, ভাইয়ের সন্তানকে সম্পত্তি দেয়া অনুচিত। অনেকক্ষেত্রে ভাই বা ভাইদের সংসারে অসচ্ছলতা কারণে বোনের সম্পত্তির প্রাপ্ত অংশ ছাড় দিতে হলেও নিজের স্বামী-সন্তানের মতামত নেয়া প্রয়োজন। এতে করে ভবিষ্যতে সংসার ও সামাজিক মনোমালিন্য, বিবাদ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
পৈতৃক সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, ভোগদখল সুপ্রতিষ্ঠিত হলে যাদের অবৈধ স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে, তাদের গাত্রদাহ হওয়াটা স্বাভাবিক। নারীর ভোগদখলের বিপক্ষে অবৈধ দখলদাররা যতই যুক্তি খোঁজুক, ফন্দি আঁটুক, পৈতৃক সম্পত্তির ওপর নারীর এই জন্মগত অধিকার অর্জন ও ভোগের জন্য মনে জোর নিয়ে একজন নারীকেই এগিয়ে আসতে হবে। নিজের কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রেও ন্যায্য পাওনা বুঝে নিতে ও বুঝিয়ে দিতে রাখতে হবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
মুসলিম আইনে দেনমোহর হলো স্বামী থেকে প্রাপ্ত স্ত্রীর ন্যায্য অধিকার। বিবাহের মাধ্যমে এই অধিকারের সৃষ্টি হয়। প্রতিটি বিয়ের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেনমোহর বাবদ ধার্য করা হয়। যা স্বামীকে অবশ্যই বিয়ের আগে অথবা বিয়ের পরে পরিশোধ করতে হয়। অন্যথা স্ত্রী তা যেকোনো সময় আইন অনুযায়ী আদায় করার অধিকার রাখে। স্বামী জীবিত অবস্থায় পরিশোধ করে যেতে না পারলে মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি থেকে তা পরিশোধ করতে হয়।
মুসলিম আইনে নারীদের যাবতীয় খরচের দায়-দায়িত্ব পুরুষের ওপর বর্তায়। উপার্জনক্ষম হলে সংসারের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব পুত্র সন্তানের উপর নাI আবার সে যখন স্বামী, তখন স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব তারI সে যখন বাবা তখন সন্তানদের ভরণপোষণ ও বিয়ের ব্যবস্থার দায়িত্ব তার। যখন সে ভাই, তখন বোনদের ভরণপোষণ এবং বিয়ের ব্যবস্থার দায়িত্ব তার। এ ছাড়া আমাদের দেশে মা-বাবার ভরণপোষণ নিয়ে আলাদা আইনও রয়েছে। ইসলাম ধর্মে এসব দায়দায়িত্ব থেকে নারীকে অব্যাহতি দিয়ে শুধু তা পুরুষের ওপরই অর্পণ করা হয়েছে। বিপরীতে কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে এসব দায়িত্ব পালন ঐচ্ছিক ব্যাপার। কন্যা সন্তান এসব দায়িত্ব পালন করতে না পারলে তাকে বাধ্য করা যাবে না।
উত্তরাধিকারসূত্রে একজন নারী সন্তান হিসেবে মা-বাবার থেকে, স্বামী মারা গেলে স্ত্রী হিসেবে স্বামীর থেকে, মা হিসেবে সন্তানের থেকে সম্পত্তির অংশ পায়। সব অংশ যোগ করলে এবং উল্লিখিত সব দিক বিবেচনা করলে নারীর অংশের সম্পত্তি, মা-বাবার থেকে পাওয়া পুরুষের অংশের সম্পত্তির চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। প্রয়োজন শুধু ন্যায্য পাওনা উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা।
সাম্প্রতিক কোনো গবেষণা পাওয়া না গেলেও ২০১৪ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ৭০ ভাগ নারীর সম্পদের ওপর মালিকানা নেই ৷ ফলে তাঁরা পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ওপর যেমন নির্ভরশীল থাকেন, তেমনি নিজেরা কিছু করতে চাইলেও তা সম্ভব হয়ে ওঠে না৷ ওই গবেষণায় দেখা যায়, ১ শতাংশ নারীর সম্পদ থাকলেও পরবর্তীতে তা হারিয়েছেন৷ ২৯ ভাগ নারী সম্পদের মালিক হয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে৷ নারী উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের ৮২ শতাংশ জানান, তাঁদের সম্পদে নিজের অধিকার বা মালিকানা নেই৷ অধিকাংশ নারীই নিজের সম্পদ ব্যবহারে কোনো মতামতও দিতে পারেন না৷ মাত্র ২৬ শতাংশ নারী মতামত দেয়ার সুযোগ পান৷ [সূত্র-ডয়চে ভেলে ১৭-০৫-২০১৯]
উপরোক্ত আলোচনায় মুসলিম আইনে একজন নারীর সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। যেখানে সম্পত্তিতে নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার বাবা, ভাই, ভাইপোদের নিষ্ঠুর আচরণের কথা তুলে ধরা হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে বাবা, ভাই, ভাইপোরা তাদের সম্পত্তিতে মেয়ে, বোন, ফুপুর ন্যায্য অধিকার আইন অনুযায়ী বন্টন করে থাকে, যদিও আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে এর সংখ্যা নিতান্তই কম। তবে, এ ধরনের উদ্যোগ সমাজ-সংসারে নারীর সম্পত্তিতে অংশীদারিত্বের অধিকারকে সুসংহত করবে।
নারীর অধিকার চাই, এমন আন্দোলন সংগ্রামে মুখরোচক বাণীর সাথে পুরুষতান্ত্রিক মনমানসিকতার পরিবর্তন পূর্বক পারিবারিক ও সামাজিক ভাবে নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার কর্তা ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী (২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২) এক সেমিনারে বলেছেন, ভূমি মন্ত্রণালয় ডিজিটাল সেবা প্রবর্তন এবং আইন ও বিধি-বিধান সংশোধন করে টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা স্থাপনে জোর দিচ্ছে। এই টেকসই ভূমি ব্যবস্থায় সঠিক দলিলাদি ছাড়া কেউ কোনো জমি দখল করে রাখতে পারবে না। ফলে অবৈধ দখলদাররা ভূমি দস্যুতার সুযোগ পাবে না। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় পারিবারিক সম্পত্তির বণ্টননামাও ডিজিটাল পদ্ধতিতে উন্নতি হবে এবং মুসলিম আইন অনুযায়ী পারিবারিক সম্পত্তিতে নারীর অধিকার সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা পাবে। monir3011@gmail.com – নিবন্ধ লেখকI

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

Dainik Renaissance

আমাদের ওয়েসাইটে আপনাকে স্বাগতম। আপনাদের আশে পাশের সকল সংবাদ দিয়ে আমাদের সহযোগীতা করুন
আপডেট সময় ১২:৩২:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৪
৬৮০ বার পড়া হয়েছে

পারিবারিক সম্পত্তিতে মুসলিম নারীর অধিকার

আপডেট সময় ১২:৩২:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

নারীও মানুষ। পারিবারিক ও সামাজিক ভাবে তাদেরও রয়েছে জন্মগত অধিকার। এই সত্যটি সুপ্রতিষ্ঠিত করতেই চলছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম। এ আধুনিক যুগেও বৈশ্বিকভাবে উচ্চারিত হতে শুনি, চাই নারীর অধিকার। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার সমাজ ব্যবস্থায় নারীর অগ্রযাত্রা, দায়িত্বশীলতা এবং সাফল্যের বয়ান গাঁথা তৈরি হলেও নারীর প্রতি সহিংসতা, নিষ্ঠুর আচরণ, তাদেরকে অর্ধ নাগরিক করে রাখার অপচেষ্টা সবসময় বিদ্যমান ছিল। আধুনিক সমাজ ব্যবস্থাতেও নানা ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছে নারীরা। এর মধ্যে পরিবারের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা অন্যতম। অনেক নারীরা তাদের অধিকার সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৬, ২৭, ২৮, ২৯ অনুচ্ছেদগুলোতে নারী-পুরুষের সমঅধিকার ঘোষণা করা হয়েছে। তবে, ব্যক্তিজীবনে অধিকার, সুযোগ, দায়িত্ব পালনে ধর্মীয় আইনের উপর নির্ভর করা হয়। যেমন- বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, সন্তানের উত্তরাধিকার, পুত্র-কন্যার সম্পত্তিতে অধিকার, নারী-পুরুষের সম্পদ সম্পত্তিতে অধিকারসমূহ। মুসলিম আইনে বাবার সম্পত্তিতে একজন ছেলে সন্তান যে ভাগ পায়, কন্যা সন্তান তার অর্ধেক পাবে। বাবা ছাড়াও অন্য সম্পর্ক থেকেও নারীরা সম্পত্তির ভাগ পেয়ে থাকে। যেমন, মা-বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় তাদের সন্তান যদি মারা যায়, তাহলে মৃত সন্তানের সম্পত্তির ভাগ তার মা-বাবা পাবেন। মৃত ব্যক্তির সন্তানসন্ততি থাকলে মা মোট সম্পত্তির ১/৬ অংশ পাবেন। যদি মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান না থাকে এবং দুই বা ততোধিক ভাইবোন থাকে, তাহলেও ১/৬ অংশ মা পাবেন। তবে মৃত ব্যক্তির সন্তানাদি না থাকলে এবং একজনের বেশি ভাই বা বোন না থাকলে মা ১/৩ অংশ পাবেন। আবার মৃত ব্যক্তির বাবা থাকলে এবং তার স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকলে স্বামী বা স্ত্রীর অংশ দেয়ার পর বাকি সম্পত্তির ১/৩ অংশ মা পাবেন। একজন নারী স্ত্রী হিসেবে মৃত স্বামীর সম্পত্তি ২ ভাবে পাবে। (১) যদি মৃত ব্যক্তির এবং তার স্ত্রীর সন্তান বা পুত্রের সন্তান থাকে তবে স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির ১/৮ ভাগ পাবেন। (২) যদি মৃত ব্যক্তি এবং তার স্ত্রীর সংসারে কোন সন্তান না থাকে তাহলে স্ত্রী মোট সম্পত্তির ১/৪ ভাগ পাবেন।
বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় বিধান থাকা সত্বেও পৈতৃক সম্পত্তিতে মুসলিম নারীর অধিকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনর্জিত থেকে যায়। এর মূল অন্তরায় সামাজিক সচেতনতার অভাব, অরাজক পরিবেশ ও নারীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ। আইন অনুযায়ী বাবা, স্বামী ও স্বজনের সম্পত্তিতে নারীর অধিকারের পরিমাণ যাই হোক না কেন, মূল প্রশ্ন হচ্ছে- এই অধিকারটুকু নারীরা অর্জন ও ভোগদখলের সুবিধা পাচ্ছেন কিনা? যদি কেউ পেয়ে থাকেন তা অবশ্যই মোটের তুলনায় খুবই নগণ্য।
আমাদের সমাজে এমন কিছু ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে যে, বাপের সম্পত্তির অংশ মেয়েরা নিয়ে নিলে স্বামীর সংসারে অনটন নেমে আসে এবং ভাই-বোনদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে, ছেলেমেয়েরা মামার বাড়িতে যাবার বা আপ্যায়ন পাবার যোগ্যতা হারায়। এটি মেয়েদের স্থায়ীভাবে ঠকানোর চতুরতা ছাড়া আর কিছুই নয়। ভাইয়েরা বোনদের অংশ ভোগদখল করলে যদি অভিশপ্ত না হয়, সম্পর্কের অবনতি না হয়, আপ্যায়নে ঘাটতি না হয়, সেক্ষেত্রে বোনদের অপরাধ কোথায়? বোনের প্রাপ্য সম্পত্তি ভাই, ফুপুর সম্পত্তি ভাইপো জোর করে ভোগদখল করবে তাতে অপরাধ হবে না অথচ পিতামাতার সম্পত্তির বৈধ অংশ কন্যা ভোগদখল করলেই অভিশপ্ত হবে, এটি নিছক ভ্রান্ত ধারণা ও অপপ্রচার ছাড়া অন্য কিছু নয়। ইসলাম ধর্মে ও আমাদের রাষ্ট্রীয় আইনে অন্যের সম্পত্তি ভোগদখল করার কোনও বৈধতা নেই। বরং কাউকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা অপরাধ। অবাক বিষয়, আমাদের সমাজে এমন অনেক বাবা আছেন, যারা কিনা ধর্মীয় সকল নিয়ম-কানুন মেনে চলেন কিন্তু নিজের মেয়ে সন্তানদের বঞ্চিত করে তার সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কূটকৌশলে ছেলের দখলে দিয়ে মরে যায়।ভাইয়ের জন্য নির্দ্বিধায় প্রাণও দিতে পারে সেই ভাই-ই বোনের প্রাপ্যাংশ না দেয়া বা কম দেয়ার জন্যে আঁটে নানান কূটকৌশল। কেউ কেউ আবার বছরে দু-একটা দাওয়াত ও কাপড়চোপড় দিয়েই সারতে চায় বোনের প্রাপ্য সম্পত্তি না দেয়ার দায়। কোনও অসতর্ক, অসুস্থতা বা বিপদের সময় বাবা, মা, ফুপু বা বোনের স্বাক্ষর বা টিপসই নিয়ে তাদেরেকে অধিকার বঞ্চিত করে বা করার চেষ্টা করে, এমন সংখ্যাও কম নয়।


মেয়েরা কখনও কখনও সম্পত্তির অধিকার চাইতে গেলে বলা হয়, তোমাকে লালন-পালন করানো হয়েছে, লেখাপড়া করানো হয়েছে, বিয়ে দেয়া হয়েছে, আবার সম্পত্তি দেবো কেন! অথচ মেয়ের চেয়ে ভালোভাবে লালন-পালন, অধিক লেখাপড়া করিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করানো, অধিক ব্যয়ে বিয়েশাদি করানো ছেলের ভোগদখলেই থাকছে সব সম্পত্তি!
আমাদের সমাজে অনেক মুসলিম নারী স্বামীর সম্পত্তিতে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বা ভোগ-দখলের জন্য যতটুকু সংগ্রাম করে, পৈতৃক সম্পত্তিতে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বা ভোগ-দখলের জন্য ততটুকু সংগ্রাম করতে দেখা যায় না। যৌক্তিক, অযৌক্তিক ও ভ্রান্ত ধারণার কারণেই হোক, পৈতৃক সম্পত্তি গ্রহণ ও ভোগদখল না করে উদারতা দেখালেও, নিঃশর্তে দলিল করে ভাইকে দিয়ে দেয় এমন নজির খুবই কম। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা তার রক্তের অধিকার পৈতৃক সম্পত্তির দাবি সত্যিকার অর্থে মন থেকে ত্যাগ করতে পারে না। এ দাবি অব্যাহত রেখেই মৃত্যুবরণ করে। নারীর মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীরা দাবি আদায় করতে গেলেই শুরু হয় বিবাদ, পারিবারিক অসামাজিক অশান্তি, হামলা-মামলার মতো অনেক ন্যক্কারজনক ঘটনা।
কোনও নারী যদি মনে করে তার পিতামাতার নিকট থেকে প্রাপ্ত অংশ ভাইকে বা ভাইয়ের সন্তানদের দিয়ে দেবেন, দিতেই পারেন তবে এটি মনে রাখা উচিত- প্রাপ্য সম্পত্তির ওপর নিজের সন্তানের অধিকার ও দাবি সবার আগে। নিজের সন্তানকে বঞ্চিত করে ভাই, ভাইয়ের সন্তানকে সম্পত্তি দেয়া অনুচিত। অনেকক্ষেত্রে ভাই বা ভাইদের সংসারে অসচ্ছলতা কারণে বোনের সম্পত্তির প্রাপ্ত অংশ ছাড় দিতে হলেও নিজের স্বামী-সন্তানের মতামত নেয়া প্রয়োজন। এতে করে ভবিষ্যতে সংসার ও সামাজিক মনোমালিন্য, বিবাদ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
পৈতৃক সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, ভোগদখল সুপ্রতিষ্ঠিত হলে যাদের অবৈধ স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে, তাদের গাত্রদাহ হওয়াটা স্বাভাবিক। নারীর ভোগদখলের বিপক্ষে অবৈধ দখলদাররা যতই যুক্তি খোঁজুক, ফন্দি আঁটুক, পৈতৃক সম্পত্তির ওপর নারীর এই জন্মগত অধিকার অর্জন ও ভোগের জন্য মনে জোর নিয়ে একজন নারীকেই এগিয়ে আসতে হবে। নিজের কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রেও ন্যায্য পাওনা বুঝে নিতে ও বুঝিয়ে দিতে রাখতে হবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
মুসলিম আইনে দেনমোহর হলো স্বামী থেকে প্রাপ্ত স্ত্রীর ন্যায্য অধিকার। বিবাহের মাধ্যমে এই অধিকারের সৃষ্টি হয়। প্রতিটি বিয়ের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেনমোহর বাবদ ধার্য করা হয়। যা স্বামীকে অবশ্যই বিয়ের আগে অথবা বিয়ের পরে পরিশোধ করতে হয়। অন্যথা স্ত্রী তা যেকোনো সময় আইন অনুযায়ী আদায় করার অধিকার রাখে। স্বামী জীবিত অবস্থায় পরিশোধ করে যেতে না পারলে মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি থেকে তা পরিশোধ করতে হয়।
মুসলিম আইনে নারীদের যাবতীয় খরচের দায়-দায়িত্ব পুরুষের ওপর বর্তায়। উপার্জনক্ষম হলে সংসারের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব পুত্র সন্তানের উপর নাI আবার সে যখন স্বামী, তখন স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব তারI সে যখন বাবা তখন সন্তানদের ভরণপোষণ ও বিয়ের ব্যবস্থার দায়িত্ব তার। যখন সে ভাই, তখন বোনদের ভরণপোষণ এবং বিয়ের ব্যবস্থার দায়িত্ব তার। এ ছাড়া আমাদের দেশে মা-বাবার ভরণপোষণ নিয়ে আলাদা আইনও রয়েছে। ইসলাম ধর্মে এসব দায়দায়িত্ব থেকে নারীকে অব্যাহতি দিয়ে শুধু তা পুরুষের ওপরই অর্পণ করা হয়েছে। বিপরীতে কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে এসব দায়িত্ব পালন ঐচ্ছিক ব্যাপার। কন্যা সন্তান এসব দায়িত্ব পালন করতে না পারলে তাকে বাধ্য করা যাবে না।
উত্তরাধিকারসূত্রে একজন নারী সন্তান হিসেবে মা-বাবার থেকে, স্বামী মারা গেলে স্ত্রী হিসেবে স্বামীর থেকে, মা হিসেবে সন্তানের থেকে সম্পত্তির অংশ পায়। সব অংশ যোগ করলে এবং উল্লিখিত সব দিক বিবেচনা করলে নারীর অংশের সম্পত্তি, মা-বাবার থেকে পাওয়া পুরুষের অংশের সম্পত্তির চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। প্রয়োজন শুধু ন্যায্য পাওনা উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা।
সাম্প্রতিক কোনো গবেষণা পাওয়া না গেলেও ২০১৪ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ৭০ ভাগ নারীর সম্পদের ওপর মালিকানা নেই ৷ ফলে তাঁরা পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ওপর যেমন নির্ভরশীল থাকেন, তেমনি নিজেরা কিছু করতে চাইলেও তা সম্ভব হয়ে ওঠে না৷ ওই গবেষণায় দেখা যায়, ১ শতাংশ নারীর সম্পদ থাকলেও পরবর্তীতে তা হারিয়েছেন৷ ২৯ ভাগ নারী সম্পদের মালিক হয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে৷ নারী উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের ৮২ শতাংশ জানান, তাঁদের সম্পদে নিজের অধিকার বা মালিকানা নেই৷ অধিকাংশ নারীই নিজের সম্পদ ব্যবহারে কোনো মতামতও দিতে পারেন না৷ মাত্র ২৬ শতাংশ নারী মতামত দেয়ার সুযোগ পান৷ [সূত্র-ডয়চে ভেলে ১৭-০৫-২০১৯]
উপরোক্ত আলোচনায় মুসলিম আইনে একজন নারীর সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। যেখানে সম্পত্তিতে নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার বাবা, ভাই, ভাইপোদের নিষ্ঠুর আচরণের কথা তুলে ধরা হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে বাবা, ভাই, ভাইপোরা তাদের সম্পত্তিতে মেয়ে, বোন, ফুপুর ন্যায্য অধিকার আইন অনুযায়ী বন্টন করে থাকে, যদিও আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে এর সংখ্যা নিতান্তই কম। তবে, এ ধরনের উদ্যোগ সমাজ-সংসারে নারীর সম্পত্তিতে অংশীদারিত্বের অধিকারকে সুসংহত করবে।
নারীর অধিকার চাই, এমন আন্দোলন সংগ্রামে মুখরোচক বাণীর সাথে পুরুষতান্ত্রিক মনমানসিকতার পরিবর্তন পূর্বক পারিবারিক ও সামাজিক ভাবে নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার কর্তা ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী (২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২) এক সেমিনারে বলেছেন, ভূমি মন্ত্রণালয় ডিজিটাল সেবা প্রবর্তন এবং আইন ও বিধি-বিধান সংশোধন করে টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা স্থাপনে জোর দিচ্ছে। এই টেকসই ভূমি ব্যবস্থায় সঠিক দলিলাদি ছাড়া কেউ কোনো জমি দখল করে রাখতে পারবে না। ফলে অবৈধ দখলদাররা ভূমি দস্যুতার সুযোগ পাবে না। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় পারিবারিক সম্পত্তির বণ্টননামাও ডিজিটাল পদ্ধতিতে উন্নতি হবে এবং মুসলিম আইন অনুযায়ী পারিবারিক সম্পত্তিতে নারীর অধিকার সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা পাবে। monir3011@gmail.com – নিবন্ধ লেখকI